আগামী নির্বাচনই হবে শেখ হাসিনার শেষ নির্বাচন ! ৫ সমস্যায় আওয়ামী লীগ

 

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসই নয়, বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি অনন্য রেকর্ড।শেখ হাসিনার মোট প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদ ১৭ বছরের বেশি। টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীত্ব করছেন। ১২ বছরের বেশী ধরে বাংলাদেশে টানা প্রধানমন্ত্রীত্ব করে তিনি এক অনন্য রেকর্ড স্থাপন করেছেন।

আওয়ামী লীগের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতারা বলছেন যে, আগামী নির্বাচন হতে পারে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শেষ নির্বাচন।


উল্লেখ্য, একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। এই সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের পর থেকে ৫ বছরের জন্য এই সংসদ গঠিত হয়। সেই হিসেবে ২৯শে জানুয়ারি বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী এই মেয়াদ পূর্তির পূর্বে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। সেই হিসেবে ২০২৩ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৪ সালের একেবারে শুরুতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। তার বয়স এই ২৮ সেপ্টেম্বরে ৭৪ বছর পূর্ণ হবে।


সেই সালের নির্বাচনের আগে তার বয়স হবে ৭৬ এর আশেপাশে অর্থাৎ বয়সের কারণেই তিনি হয়তো আর নিজেকে সংসদ নির্বাচন এবং রাজনীতি থেকে জড়াবেন না। আওয়ামী লীগ সভাপতি বিভিন্ন সময় রাজনীতি থেকে অবসরের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে গত তিনটি কাউন্সিলেই তিনি দলের নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন কিন্তু নেতাকর্মীদের বিপুল আপত্তি এবং আবেগের কাছে শেষ পর্যন্ত তিনি পরাস্ত হন এবং দলের দায়িত্বে তিনি থাকতে বাধ্য হন।


আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মীরাই মনে করেন যে, শেখ হাসিনার কোন বিকল্প নেই। শেখ হাসিনার বিকল্প শুধুমাত্র শেখ হাসিনাই। তারা এটাও মনে করেন, তিনি যতদিন জীবিত থাকবেন ততদিনই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি থাকবেন। তিনি আওয়ামী লীগের ঐক্য এবং স্বপ্নের প্রতীক বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের সমস্ত নেতা কর্মীরা। এরকম বাস্তবতায় আগামী নির্বাচনে অর্থাৎ ২০২৩-২৪ নির্বাচনই যদি শেখ হাসিনার শেষ নির্বাচন হয় তাহলে সেই নির্বাচনটি হবে অত্যন্ত আবেগঘন এবং গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। এই নির্বাচনটি আওয়ামী লীগের জন্য অত্যন্ত আবেগের নির্বাচন হবে বলেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করছেন।


তবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করেন যে, শেখ হাসিনা যতই বলুক যে আগামী নির্বাচনের পর আর নির্বাচন করবেন না সেটি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আওয়ামী লীগের এক জন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেছেন যে, শেখ হাসিনাকে আল্লাহ যতদিন রাখবেন ততদিনই তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকবেন এবং তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ নির্বাচন করবে। আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেছেন, এখন মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, বয়স্ক মানুষের কর্মক্ষমতা বেড়েছে।


কাজেই শেখ হাসিনার এই অবসর ভাবনা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এখনও তিনি জাতির আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। সেই জন্য আগে আগামী নির্বাচন হোক। তারপর শেখ হাসিনার অবসর ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। এ পর্যায়ে এই আলোচনা অর্থহীন বলেও আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাই মনে করেন।


৫ সমস্যায় আওয়ামী লীগের উদ্বেগ বাড়ছে

টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নেই বললেই চলে। কিন্তু তারপরও আওয়ামী লীগ স্বস্তিতে নেই। অন্য দলের আক্রমণ বা ভয়ে ভীত নয় আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সমস্যা আছে তার নিজেকে নিয়ে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে দলের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, জনগণের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব হচ্ছে এবং আওয়ামী লীগ আগের মতো আওয়ামী লীগ নেই বলেই অনেকে মনে করছেন। যে পাঁচটি সমস্যা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উদ্বিগ্ন তার মধ্যে রয়েছে:


১. সিনিয়র নেতৃত্বের উদাসীনতা: আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের সংকট চরম ভাবে দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পর আর কোনো নেতা দলের সব মানুষের কাছে তেমন আস্থাভাজন এবং জনপ্রিয় নয়। দলের সাধারণ সম্পাদক প্রেস কনফারেন্স করছেন কিন্তু নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার দূরত্ব আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে বলেও অনেকে মনে করেন। একমাত্র প্রেসিডিয়ামের সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং আব্দুর রহমান ছাড়া প্রেসিডিয়ামের অন্য কোন সদস্যের কোন সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। প্রেসিডিয়ামের সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক মন্ত্রী হওয়ার পরও কিছু কিছু সাংগঠনিক তৎপরতার মধ্যে নিজেকে যুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ ভাবে তার এলাকাভিত্তিক। অন্যান্য প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে বেগম মতিয়া চৌধুরী কিছু কিছু কাজ করছেন কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে তিনি তেমন ভূমিকা রাখছেন না। আর বাকি প্রেসিডিয়ামের সদস্যরা কোন সাংগঠনিক তৎপরতা দৃশ্যমান নন।


২. মাঠ পর্যায়ে কোন্দল: আওয়ামী লীগের এখন সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাঠ পর্যায়ের কোন্দল। বিশেষ করে তৃণমূলের প্রায় সব জেলা-উপজেলায় যেন দুটো করে আওয়ামী লীগ তৈরি হয়েছে এবং এই কোন্দলগুলো বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হচ্ছে। কোন্দল এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে এটিকে যেন নিয়ন্ত্রণ করার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।


৩. এমপি লীগ হাইব্রিড: আওয়ামী লীগের এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে এমপি লীগ এবং হাইব্রিড। বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের এমপিরা তাদের নিজেদের পছন্দমতো কমিটি গঠন করেছেন এবং এই কমিটিতে সত্যিকারের আওয়ামী লীগাররা নেই। বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসে আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এরকম কিছু কমিটি বাতিল করা হলেও সেটি নিয়েও প্রতিবাদ হচ্ছে। আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক স্বীকার করেছেন যে, এমপি লীগ এখন আওয়ামী লীগের বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন গুলোতে এমপিরা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন যেখানে পছন্দের প্রার্থী দিতে পারেননি সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী দিয়েছেন।


৪. কমিটি বাণিজ্য: আওয়ামী লীগের কমিটি বাণিজ্য একটি বড় সংকট হিসেবে সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম প্রকাশ্যে বলেছেন যে, কমিটি বাণিজ্য এবং পদ বাণিজ্য করে কোন কোন নেতা দলের সর্বনাশ করছেন। তিনি যেকোনো মূল্যে কমিটি বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য দাবি জানিয়েছেন। তারপরও ঢাকা মহানগরী সহ বিভিন্ন স্থানে কমিটি গঠন নিয়ে নানারকম বাণিজ্যের খবর শোনা যাচ্ছে, এটি আওয়ামী লীগের একটি বড় উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছেন দলের নেতাকর্মীরা।

৫. সহযোগী সংগঠনগুলোর স্থবিরতা: আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলো একসময় ব্যাপক তৎপর এবং কর্ম উদ্দীপ্ত ছিলো। বিশেষ করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৎপরতা ছিল দৃশ্যমান চোখে পড়ার মত। কিন্তু এখন অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলো শুধুমাত্র দিবস ভিত্তিক কর্মকাণ্ডে নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছে। তেমন কোনো দলীয় কর্মকাণ্ডে তাদেরকে দেখা যায় না, এটি আওয়ামী লীগের জন্য আরেকটি উদ্বেগ এবং সংকটের কারণ বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।



আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা স্বীকার করছেন যে, আগামী দুই বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগকে একটি নির্বাচনে যেতে হবে এবং এই নির্বাচনটি হবে এ যাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর, কঠিন নির্বাচন। আর সেই কারণেই এখন থেকেই সংগঠনের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংগঠন শক্তিশালী না হলে নির্বাচনে ভালো ফলাফল করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আর এজন্যই এই পাঁচ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার জন্য তারা তাগিদ অনুভব করছেন। তবে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রগুলো বলছে যে, এইসব বাস্তবতা আওয়ামী লীগ হয়তো একটি আগাম কাউন্সিলের দিকে যাচ্ছে। আগামী মার্চের মধ্যে আগাম কাউন্সিল হতে পারে এমন গুঞ্জন আওয়ামী লীগে শোনা যাচ্ছে।


Comments

Popular posts from this blog

এই সেইপ্রদীপসাহা

জামিন না পেয়ে কারাগারে পরীমণি

এ যে জীবন নামের মরন পুরী