খোকার পড়াশোনা


 খোকার লেখাপড়া শুরু হয়েছিল স্থানীয় এম ই স্কুলে। এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন খোকার ছোট দাদা খান সাহেব শেখ আব্দুর রশিদ। পড়াশোনার চেয়ে দুরন্তপনায় ছিলো খোকার  চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লেখাপড়া, খেলাধুলা, মারামারি সবি চলতো সমান্তরালে। এভাবে খোকা একে একে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি পড়াশোনা শেষ করল এই স্কুল থেকেই। 

খোকার আব্বা গোপালগঞ্জ শহরে একটি বাসা তৈরি করেছিলেন। কাজেই চতুর্থ শ্রেণিতে খোকাকে ভর্তি করা হল গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে। তবে সমস্যা সৃষ্টি হলো আরেকটি।  খোকার আম্মা শহরে থাকতে মোটেও রাজী নন। তিনি বাড়ির  সমস্ত সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন আর বলতেন, আমার বাবা আমাকে সম্পত্তি দিয়ে গেছেন, যাতে তাঁর বাড়িতে আমি থাকি। শহরে চলে গেলে ঘরে আলো জ্বলবে না। বাবা অভিশাপ দেবেন। 

অগত্যা গোপালগঞ্জ শহরে শুরু হলো বাপ-বেটার সংসার। তবে খোকার জন্য এটা হল শাপে বর। কারণ সেই ছোটবেলায় থেকেই আব্বার গলা ধরে না ঘুমালে খোকার যেন ঘুমই আসতো না। আব্বার কাছ থেকেই খোকা ছোটবেলায় লেখাপড়ায় হাতে খড়ি । খোকার বয়স যখন ১৪ বছর তখন সে সপ্তম শ্রেণীতে পড়তো। এখন অবশ্য আরও কম বয়সে সপ্তম শ্রেণীতে পড়া যায়। তখন একটু বেশি বয়সে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা শুরু করত। কারন তখন ছেলেমেয়েদের একটি সুন্দর শৈশব ছিল। তারা মন ভরে খেলাধুলা করত,দুষ্টামি করত। এ কারণে তাদের আইকিউ অনেক শার্প  থাকত। 

সপ্তম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় হঠাৎ করে বেরিবেরি রোগে অসুস্থ হয়ে পড়ল খোকা।  এ রোগের কারণে তার হার্ট দুর্বল হয়ে যায়। পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হয়। 

আরো দুবছর পর খোকার চোখের সমস্যা দেখা দিল এবং ধরা পরল গ্লুকোমা রোগ। আবারো পড়াশোনায় আঘাত নেমে আসে খোকার।এবার দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। কলকাতায় গিয়ে চোখ অপারেশন করতে হলো।  অপারেশন ভালোই হলো।  কিন্তু সমস্যা হলো চোখের উপর কোন চাপ দেওয়া যাবে না। পড়াশোনা করতে গেলে চোখের উপর স্বাভাবিকভাবে চাপ পড়বেই। কাজেই পড়াশোনা একেবারে  বন্ধ।  কি আর করা। লেখাপড়া নেই, খেলাধুলার নেই, শুধু শুধু বসে সময় কাটানো যায় নাকি! খোকা তো ঘরে বসে থাকার বান্দা নন। 

সেই  সময় ছিলো স্বদেশী আন্দোলনের ঢেউ। খোকা তখন একটাই কাজ করতে শুরু করে ।  বিকেল বেলায় স্বদেশী আন্দোলনের বিভিন্ন সভা সমাবেশে উপস্থিত থাকা। এভাবে প্রায় প্রতিটি সভায় খোকাকে বসে থাকতে দেখে কিছু লোকের নজর পড়ল তার দিকে।  তখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে খোকার  মনেও। তার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে, ইংরেজিদের এদেশে থাকার কোন অধিকার নেই। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আনতে হবে। 


১৭ বছর বয়সে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে খোকার পড়াশোনা আবার নতুন করে শুরু হল। এর মধ্যে অবিভক্ত বাংলার দুই নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ শহরে আসে।  নেতাদের জনসভায় খোকা সংবর্ধনার আয়োজন করেছিল। সংবর্ধনা শেষে খোকার সাথে শহীদ সাহেবের একটু ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। তিনি খোকার নাম ঠিকানা নিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি খোকাকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি চিঠিও দিয়েছিলেন। তার সেই চিঠির উত্তর দিয়েছিল খোকা।  সেই চিঠিতে খোকাকে কলকাতায় গেলে তার সাথে দেখা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন শহীদ সাহেব । এভাবেই  শহীদ সাহেবের সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেয়েছিল খোকার।

তারপর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে সক্ষতায় রাজনৈতিক সক্রিয় একজন কর্মী হয়ে উঠে খোকা।এ সময় খেলাধুলা রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্যেও দস্তুর লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিল খোকা। 


খোকা মেট্রিক পরীক্ষা দিবে। প্রস্তুতি ভালোই। সমস্যা শুধু গনিতে। গনিতে ভালো করলে প্রথম বিভাগ হয়ে যেতে পারে। মনে ভীষন আশঙ্কা। গণিতের জন্য বোধহয় প্রথম বিভাগ মিস হয়ে যেতে পারে।খোকার বাবা খোকার জন্য মনোরঞ্জন বাবু নামের এক গনিতের শিক্ষককে ঠিক করলেন। তিনি খুব আন্তরিকতার সাথে খোকার গনিতের সকল প্রকার ভয় দূর করে দিলেন।  ইংরেজির দায়িত্ব দিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক রঞ্জন সেনগুপ্ত কে। সব মিলিয়ে  পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালই ছিল। 

কিন্তু যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল। পরীক্ষার একদিন আগে খোকার ভীষণ জ্বর হলো। শুধু জ্বর হলেও একটা কথা ছিল, মামস হয়ে খোকার গলা ফুলে গেলো। খোকার আব্বা পড়লেন  মহাবিপদে । গোপালগঞ্জ টাউনের প্রায় সব ডাক্তারকেই আনালেন।  কিন্তু কিছুতেই জ্বর  নামছে না। তিনি ছেলের কাছে বসে রইলেন। জ্বর বাড়তে বাড়তে ১০৪ ডিগ্রী হয়ে গেছে। 

খোকার আব্বা খোকাকে বললেন, বাবা পরীক্ষা দেওয়ার আর দরকার নেই। অসুস্থ খোকা  বলে উঠলো, পরীক্ষা তো আমাকে দিতেই হবে আব্বা। এতো পরিশ্রম করে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। কিন্তু আগে সুস্থ হতে হবে তো! জ্বর কমলো না হয় কথা ছিল। যা পারি পরীক্ষা দিব। দরকার হলে শুয়ে-শুয়ে পরীক্ষা দিব। খোকার সাব জবাব। দুরন্ত খোকা পড়াশোনা নিয়ে কতই না দুরন্তপনা করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। যে খোকার পড়াশোনা ভালো লাগতোনা,  সে কিনা আজ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছে।  

প্রথম দিন বাংলা পরীক্ষা। সকালের পরীক্ষায় খোকা মাথায় তুলতে পারলেন না। খোকার জন্য বিছানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ অবস্থার মধ্যেও খোকা পরীক্ষা দিল। কিছু কিছু লিখলো। যা পারে তাই পরীক্ষা দিল। বিকেলে জ্বর  কিছুটা কমলো। অন্য পরীক্ষাগুলো ভালোই হলো। পরীক্ষা শেষে যথারীতি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন সবাই। বিশেষ করে খোকার আব্বা।  যথাসময়ে ফলাফল প্রকাশিত হলো। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সব বিষয়ে দ্বিতীয় বিভাগ মার্কস পেয়েছে খোকা। কিন্তু বাংলায় কম মার্কস পেয়েছে। খোকার মনটা ভেঙে গেল। খোকা পরবর্তীতে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে ভীষনভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সভা সমাবেশে তার উপস্থিত থাকা । ম্যাট্রিক পরীক্ষাটা খোকার জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট।

যদি পরীক্ষার সময় অসুস্থ হয়ে না পড়ত! যদি সে প্রথম বিভাগ পেত!আসলে ভাগ্যের লিখন না যায় খন্ডন। নইলে খোকার জীবনটা হয়তো অন্য পথে ও পরিচালিত হতো পারতো। 

Comments

Popular posts from this blog

এই সেইপ্রদীপসাহা

জামিন না পেয়ে কারাগারে পরীমণি

এ যে জীবন নামের মরন পুরী