আমি কিন্তু সেনাপ্রধান হতে চাইনি।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ’৭১ –এর সভাপতি ও মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ।
মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের সৈনিক হিসেবে এবং সেই সময়ে যাকে বঙ্গবন্ধু সেনাপ্রধান এর দায়িত্ব নির্ভয়ে যার উপর নাস্ত করেছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে তারই নিয়ন্ত্রিত সেনাবাহিনীর হাতে বঙ্গবন্ধুর পরিবার সহ সকলকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে এ জাতী ইতিহাসে যে কলঙ্ক ময় অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল।তাই উনার সম্পর্কে, বা উনার সেদিনের ব্যার্থ তাকে উনি বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করলেও, জনমনে অনেক অজানা প্রশ্ন থেকেই যায়। তিনি এখন বলছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান হিসেবে তাকে নিয়োগ করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের মস্ত বড় ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেছেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ’৭১ –এর সভাপতি ও মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ।
তিনি বলেছেন, ‘সেনাবাহিনীর মধ্য থেকেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। আর আমি তখন ছিলাম সেনাপ্রধান। বঙ্গবন্ধু একটা মস্ত বড় ভুল করেছিলেন, সেটা হচ্ছে আমাকে সেনাপ্রধান করে আর জিয়াউর রহমানকে উপপ্রধান করে।’
মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম- মুক্তিযুদ্ধ’৭১ আয়োজিত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
বঙ্গবন্ধুর ওই সিদ্ধান্তের প্রতি একমত ছিলেন না মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সেক্টর কমান্ডার। তিনি তখন সেনাপ্রধান হতে রাজি ছিলেনও না। এমনটা উল্লেখ্য করে সফিউল্লাহ বলেন, ‘আমি কিন্তু সেনাপ্রধান হতে চাইনি। জেনারেল ওসমানী ৫ এপ্রিল ডেকে বললেন, “তুমি আর্মি টেক ওভার করো।” আমি বললাম, আমার সিনিয়র আছে। আমার তিনজন সিনিয়রের নাম বললাম। কর্নেল রব, দত্ত ও জিয়াউর রহমান। আমরা একই ব্যাচের হলেও জিয়াউর রহমান আমার চেয়ে ১ নম্বরের সিনিয়র ছিলেন। তখন আমি বললাম, এটা ঠিক হবে না। আমি বললাম, স্যার, এ সময়ে কী কাজটা করা ঠিক হবে? আমাদের মধ্যে তো একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। অফিশিয়াল সিদ্ধান্ত হোক আর যাহোক, এটা ঠিক হচ্ছে না।’
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ করতে তার কিছু করারও ছিল না বলেও দাবি করেন সাবেক এই সেনাপ্রধান। তার ভাষ্য, ‘আমি জানি, অনেকেই বলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার সময় আমি সেনাপ্রধান ছিলাম। কিন্তু কিছুই করতে পারিনি। আমার সে সময় সামর্থ্য ছিল না। কী করতে পারতাম। ওই সময়ে কিছু করার মতো আমাদের পজিশন ছিল না।’
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাংলাদেশের নেতা নয়, তিনি বিশ্বনেতা ছিলেন। জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে শোষক অন্যদিকে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে। যুদ্ধ বন্ধ করেন। অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধ করেন। অস্ত্র কেনার টাকা দিয়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় করেন।’’
আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিকভাবে খুবই দুরদর্শী ছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ- নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। তিনি জনগনের ম্যান্ডেট নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এজন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলতে পারেনি।’
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, ‘বাপ দাদার খোঁজ নাই, তারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক দাবি করে। কোথাকার কোন জিয়া নাকি স্বাধীনতার ঘোষক। খালেদা জিয়াও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেন। এগুলো উদ্দেশ্যমূলক।’
সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১–এর মহাসচিব হারুন হাবীব বলেন, জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। অনেক ঘাতকের বিচার হয়েছে। কয়েকজন বিদেশে আছেন। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড কোনো ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড শুধু নয়। এর পেছনে বাংলাদেশবিরোধী চক্রের হাত ছিল। হারুন হাবীব বলেন, শুধু বিচার করলেই হবে না। একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। এর পেছনের কুশীলব, ষড়যন্ত্রকারী যারা বেসামরিক, সামরিক এমনকি আওয়ামী লীগের যারা জড়িত ছিল, তাদের নাম ও পরিচয় নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. নুরুল আলম, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১–এর মহাসচিব হারুন হাবীব, সহ-সভাপতি আনোয়ার উল আলম, যুগ্ম মহাসচিব আবদুল মাবুদ, গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুল হাই প্রমুখ।

Comments
Post a Comment