আত্মস্বীকৃত অপরাধী--- পার্ট / ০১


আমাদের গ্রামটি দেখতে মোটামুটি একটি দ্বীপের ন্যায়। বর্ষার সময় গ্রামের দুপাশের বিলদুটি যখন বর্ষার পানিতে টইটম্বুর, তখন দ্বীপের ন্যায় গ্রমটি দুর থেকে মনে হতো আস্ত পানিতে ভেসে থাকা এক উপত্যকা বৈকী আর কিছুই মনে হয় না। 

গ্রামটিতে হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রায় ১০০০( এক হাজার)  লোকের বাস।ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, নিভৃত এই পল্লীতে মানুষ অনেক কষ্ট করে কৃষির ওপর নির্ভরশীল হয়ে কেউ না কামলা দিয়ে, কেউ বা অন্যের জমি বর্গা চাষের মাধ্যমে অনেক কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করে আসিতেছেন। এই গ্রামের কৃষকদের উঁচু ভিটা জমির পরিমাণ অতি সামান্য। দুপাশের বিল থেকে যখন পানি নামতে থাকে, তখন আস্তে আস্তে বোরো আবাদের জন্য কৃষক রা প্রস্তুতি গ্রহন করে। আর যে জমিগুলোর পানি আগে শুকাতো, সেই জমিগুলোতে সবাই সরিষার বীজ বপন করতো। যখন এই সরিষা গাছে ফুল ফুটতো, তখন গ্রামের দুপাশে কেবল হলুদ সরিষা ফুলের মনোরম দৃশ্য যে কারও মন জুড়িয়ে যেত।মনে হতো এ যেন কোন পুষ্প বাগান, যা সারাটা গ্রামের সৌন্দর্য তুলে ধরে। 


গ্রামে খেলাধুলার জন্য কোন মাঠ বা উপযুক্ত কোন খোলা জায়গা ছিলো না।তাই পানি আস্তে আস্তে নেমে যেতে যেতে কোন বছর দেখতাম বিলে কাক পক্কি খাওয়ার মতো ও এক চিমটি পানি থাকতো না।আবার কোন বছর দেখতাম বিলের কুয়া

গুলোতে( অপেক্ষাকৃত নীচু জলাসয়) ছাড়া বা বিলের শেষ তলানীতে যাকে আমরা গ্রামের ভাষায় ম্যান্দ্যা বলি, এইটুকু বাদে আর পানি থাকতো না।বিলে প্রচুর ঘাস জন্মাতো।বিভিন্ন প্রজাতির ঘাস,যা গৃহপালিত পশু র উত্তম খাদ্যের অভাব মিটাতো অনায়াসে। আর হৈচৈ করে  ক্রিকেট,ফুটবল সহ বন্ধু বান্ধব এলাকার ছোট বড় সবাই আমরা এই সময়টা খেলাধুলাই বেশি ব্যাস্ত থাকতাম। 

খেলাধুলার জন্য পানি শুকানো নরম মাটিতে যা সবে মাত্র একটু শক্ত হতে থাকে এবং গ্রামের ছেলে মেয়েরা খেলতে গেলে অনেক কৃষক দেখতাম নিজ নিজ যতটুকু জমি,তাতে খেলতে দিতে চাইতো না। তাই ইচ্ছে করেই অনেকে সরিষা বীচ বুনে রাখতো।কারন খেলা ধূলার ফলে নাকি মাটি অনেক শক্ত হয়ে  যেতো। পানি দেওয়ার পরও মাটি গুলো নাকি সাধারণ অন্য মাটির মত হাল চাষ করা সম্ভব হয়না। তাই অনেক জমি ওয়ালার সাথে গ্রামের ছেলে মেয়ে দের খেলা ধুলার জন্য  গন্ডগোল, মারামারি নিত্য বিষয় মনে হতো।

কিন্তু গ্রামের এক প্রভাবশালী মেম্বার পরিবারের সন্তান হিসাবে এবং বিলের এই অধিকাংশ জমির মালিক আমার বাপ চাচারা হওয়ায় গ্রামের ছেলে মেয়ে রা খেলা ধূলার সময় আমার উপস্থিতি একান্তই কামনা করতো। কারণ আমি থাকলে ওরা যার জমির  খেলাধুলার জন্য ব্যবহার করুক না কেন ' আমি থাকলে কেউ কিছুই বলতো না, বা বললেও আমি কিছু বললে শত্রু মিত্র সবাই শুনতো।

যাই হোক,  নেতার ঘরের সন্তানরাই নেতার দায়িত্ব পায় বা নেতৃত্ব দিবে বলে সবাই মনে করে এবং গ্রহণ করে।   গ্রামের একজন ভালো ছাত্র হিসেবে এবং পরপর ইউপি সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সুবাদে নেতার ছেলে হিসাবে এবং সুন্দর সাবলীল মার্জিত এবং মেধাবী ছাত্র হিসেবে এবং গ্রামের সবাইকে সম্মান করার খাতিরে সবাই যেমন  ভালোবাসতো আমাকে, তেমনি আমি নিজেও গ্রামের ছোট বড় সকলকেই যার যতটুকু সম্মান প্রাপ্য ততটুকুই সম্মান স্নেহ আদর ভালোবাসা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। এলাকার কোনো গরিব মানুষ আমার কাছে সেই ছোট অবস্থায় থেকেই, ঝাঁড়ের বাঁশ বা কিস্তির জন্য ধার বা প্রয়োজনীয়  কিছু চেয়ে একবারে বিফলে গেছে এমন ঘটনা খুবই বিরল। গ্রামের সব ছেলেমেয়েরাই আমাকে নেতৃত্বের কাতারে রাখতে পছন্দ করতো, যা ছোট বেলা থেকেই কিছুটা নেতৃত্ব দানের গুণাবলী আয়ত্ব করতে অনুপ্রানীত করেছে, চেষ্টা করেছি।  কোন জমিতে খেলতে দিচ্ছে না বা কোন ছেলের পড়াশুনা টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে আছে, সবকিছুই আমার কানে আসতো এবং সবকিছু সমাধান গ্রামের ছেলে-মেয়েরা আমার কাছে প্রত্যাশা করতো এবং যথাযথ তাদের চাওয়া পাওয়ার প্রতি সম্মান দেখানো এবং আমি যথাযথভাবে তাদের সেই চাওয়া-পাওয়ার প্রতি সর্বোচ্চ চেষ্টার কোন কমতি আমার কখনোই ছিল না।

Comments

Popular posts from this blog

এই সেইপ্রদীপসাহা

জামিন না পেয়ে কারাগারে পরীমণি

এ যে জীবন নামের মরন পুরী